মায়ের সংগ্রাম ও ত্যাগ – ছয় সন্তানকে লালন করার কাহিনি
মায়ের ত্যাগ ও বিদায়ী আত্মার যাত্রা
১. শৈশব ও পরিবারের সংগ্রাম
আমি ছোটোবেলায় আমাদের চার বোন দুই ভাই—আমার চেয়ে বড়রা সবাই ছিলেন। বাবা চিত্তরঞ্জন কটন মিলস্ এ আউট-অফ সাইট ক্যালেন্ডার মেশিনে কাজ করতেন। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। হঠাৎ এক দুপুরে, ক্যালেন্ডার মেশিনের কাপড় গালানোর সময় বাবার বাম হাতের পাঁচটি আঙুল মেশিনের মধ্যে চাপা পড়ে। এর পর বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়েছিলেন। সংসার চালানো তখন খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।
২. মায়ের ত্যাগ ও প্রতিকূলতার মোকাবিলা
আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জন ছিল বড়দাদা আদর্শের কটন মিলের নামমাত্র বেতন। সে দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব। মা তখন যা করতেন:
- মিলের কোয়ার্টারের পেছনে দুনদুল (সবজি) গাছ রোপণ করতেন। এই গাছ থেকে প্রচুর ফল পাওয়া যেত, যা বাজারে বিক্রি করে আটা ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী কিনতেন।
- আমাদের তিন বেলার খাবার ঠিক রাখতে, মা বাজার থেকে ছোট অল্পমূল্যে আনা আটা দিয়ে রান্না করতেন।
- মাটির বাউন্ডারিতে গোবর সংগ্রহ করে শুকিয়ে রান্নাঘরে ব্যবহার করতেন, যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
- বিত্তশালীদের খাবারের পানি সংগ্রহ করে কিছু টাকা উপার্জন করতেন এবং সেই টাকা বাবার চিকিৎসায় ব্যয় করতেন।
৩. মা-ছাত্রীর আত্মিক বন্ধন
মায়ের প্রতি আমার ভালোবাসা অমোঘ। তাঁর ত্যাগ, প্রতিকূলতার মোকাবিলা, আমাদের জন্য রাতদিন পরিশ্রম—সব কিছু আজও আমার মনে অম্লান। মা কখনো আমাদের দুঃখ অনুভব করতে দেননি, সবকিছু নিজের কষ্টের সঙ্গে চেপে রাখতেন।
৪. দেহ ও আত্মার চূড়ান্ত অবস্থা
আমি কল্পনা করি, যখন আমার জীবন শেষ হবে এবং আমাকে কাচা বাঁশের খাটে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হবে:
- দেহ শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। শরীর ধীরে ধীরে শ্মশানের আগুনে মিলিত হবে।
- চুল, ত্বক, মাংস—all প্রাকৃতিক উপাদানে পরিবর্তিত হয়ে ধোঁয়া হয়ে যাবে, পৃথিবীর মাটিতে মিলিত হবে।
- আত্মা শারীরিক বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে এক ধরণের শান্ত ও নীরব পর্যবেক্ষক হয়ে যাবে।
- আত্মা অনুভব করবে তার প্রিয়জন, স্মৃতি এবং পৃথিবীর প্রতি শেষবারের দৃষ্টি।
৫. আত্মার বিদায়ের অনুভূতি
মৃত্যুর পর আত্মা হয়তো নীরব, শান্ত এবং গভীরতায় মনোযোগী। এটি শারীরিক ব্যথা থেকে মুক্ত। আত্মা স্মৃতিগুলোকে একভাবে সংরক্ষণ করে, বিশেষত মায়ের ত্যাগ ও ভালোবাসাকে।
“আমার দেহ চলে যাবে, কিন্তু মায়ের ত্যাগ ও ভালোবাসা আমার আত্মায় অমলিন থেকে যাবে।”
৬. স্মৃতির শক্তি
আমার মা নেই, বাবা নেই, বড়দাদা নেই। কেবল আমি বেঁচে আছি। কিন্তু স্মৃতি, ভালোবাসা, মায়ের ত্যাগ—এগুলো চিরন্তন। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এই সব কিছু আত্মার সঙ্গে মিলিত হয়। দেহ নিঃশেষ হলেও আত্মার যাত্রা অব্যাহত থাকে, শান্তি ও ভালোবাসায় ভরা।
|
নিতাই বাবু
পুরস্কারপ্রাপ্ত নাগরিক সাংবাদিক – ২০১৭। লেখালেখির শুরু শৈশবে, এখনো চলছে। 🌐 ব্লগ: নিতাই বাবু ব্লগ | জীবনের ঘটনা | চ্যাটজিপিটি ভাবনা |

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
nitaibabunitaibabu@gmail.com