পবিত্র ব্রহ্মপুত্র নদে পূণ্যস্নান করে আমি কি পাপ মুক্ত হয়েছি? – লাঙ্গলবন্ধ মহাঅষ্টমী স্নানের কাহিনী
পবিত্র ব্রহ্মপুত্র নদে পূণ্যস্নান করে আমি কি পাপ মুক্ত হয়েছি?
নিতাই বাবু
Published 06:30pm : Updated :
এই চৈত্রমাস আসলেই আমি একটা দুশ্চিন্তায় থাকি সব সময়৷ কারণ হলো লাঙ্গলবন্ধ স্নান! সারাদিন বাইরে কাজ করে ঘরে আসলেই শুরু হয় ঐ লাঙ্গলবন্ধের প্রেমতলার বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ৷ আর এই আওয়াজ হলো আমার স্ত্রীর গলার আওয়াজ৷ এবার আর ছাড়বো না, এবার যেতেই হবে, মা বাড়ি থেকে এখানে আসছে স্নানে যাওয়ার জন্য, তোমাকে সাথে যেতেই হবে ইত্যাদি ইত্যাদি৷আমার স্ত্রী আবার খুবই ধার্মিক, স্বামী ভক্তি না থাকলেও গুরুভক্তি আনেক৷ স্বামীর চরণ ছুঁইয়ে ভক্তি না দিলেও গুরুর চরণের আঙ্গুল চেঁটে খাওয়া লোক আমার স্ত্রী৷ যাক সব কথা, কিন্তু আমার কথা হলো যে স্নানে যেয়ে স্নান করলে যদি পাপ মোছনই হতো, তবে মানুষ সারা বছর পাপযুক্ত যত কাজ আছে সব কাজ সম্পাদন করে চৈত্রমাসের এই দিনকার আশায় থাকত৷ সমস্যা নাই পাপের কাজ করার জন্য৷ স্নানতো আছে? লাঙ্গলবন্ধের ব্রহ্মপুত্র নদ তো আছে? সেখানে গিয়ে স্নান করলেই তো পাপমুক্ত হয়ে যাব৷
এসব কথাগুলো আমার স্ত্রীকে শোনালাম, যাতে সে যেন বুঝতে পারে পাপ মোছনের জায়গা লাঙ্গলবন্ধের ব্রহ্মপুত্র নদ নয়, পাপ মোছনের জায়গা হলো নিজের মনের ভিতর৷ এটা শুধু আমার কোমলমনা স্ত্রীকে বুঝাইতে চেয়েছিলাম, কিন্তু না, দাড়ায় বিপরীত দিক৷ কোন কথা শুনতে সে নারাজ, সে যবেই যাবে না আর হয় না৷ সংসারক্ষেত্রে স্ত্রীর বাক্য তো শুনতেই হয়, না শুনেতো আর উপায় নেই৷
তারপর ও স্ত্রীকে বুঝাতে চেয়েছিলাম যে, আগে তুমি তোমার মনকে স্নান করাও তারপর না হয় স্নানে যাও৷ আমার কথা শুনে আমাকে আমার স্ত্রী বলে তুমি লাঙ্গলবন্ধের কি জান? জানলে বলো কোথায় থেকে কি হলো৷ তখন আমার স্ত্রীকে বললাম শোন তা হলে৷
শোন শোন ওগো আমার কোমল মনা রমণী, শোন তবে বলছি আমি লাঙ্গলবন্ধের কাহিনী। পুরাণ মিথ হতে পাওয়া যায় একটা চরিত্র, পরশুরাম টেনে আনে এই আধি ব্রহ্মপুত্র। পরশু কথার অর্থ হলো হাতের কুঠার; রাম কথার অর্থ হলো বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার।
পরশুরামের বাবা ছিলেন জমদগ্নি মণি, মা ছিলেন রেনুকা দেবী লোকের মুখে শুনি। ঘরে ছিলেন পরশুরামের আরো চারভাই, পরশুরাম সহ ছিলেন তাহারা পাঁচ ভাই। একদিন রেনুকা দেবী গেল গঙ্গা স্নানে, শতবাহু রাজার কৃর্তী দেখল দুইনয়নে। শতবাহু রাজা তখন শত স্ত্রী নিয়া, জলকেলি খেলা রাজায় যায় খেলিয়া।
রাজার খেলা দেখে রেনুকা ভাবে মনেমনে, আমি যদি থাকতাম এখন ঐ রাজার সনে। এই ভেবে রেনুকা ভাবতে লাগল, এদিকে তাহার পূজার সময় শেষ হতে চলল। বিলম্ব করে রেনুকা ঘরে ফারে যায়, এতক্ষণ তুমি কোথায় ছিলা মণি জানতে চায়। স্বামীর কথায় রেনুকা উত্তর না দিলো, ক্ষিপ্ত হয়ে মণি তখন ছেলেদের বলল "পাঁচজন পুত্র আমার আছে বর্তমান, তোদের মায়ের কথা শুনলে হবে অপমান। দুষ্টমনা রমণী আমার আগে না জানতাম, জানলে আমি তোদের মাকে ঘরে রাখতাম না। যা দেখলাম ধ্যানে আমি তা বলবো না, হত্যা কর তোদের মাকে পাপ হবে না।"
পিতার বাক্য শুনলো যখন তারা পাঁচভাই, চারভাই বলে মাতৃহন্তা মহা পাপ চলো পলাই। চলে গেল চার ভাই, রইল পরশুরাম। জমদগ্নি মণি বলে বাছাধন তোমারে বললাম- শোন যদি আমার বাক্য পাবে বর তুমি, স্বর্গবাসি হবে তুমি বলে দিলাম আমি।
পিতার আদেশ পেয়ে পরশুরাম কুঠার হাতে নিলো, বরের আশায়। পরশুরাম মায়ের মাথায় আঘাত করলো। সেই আঘাতে মা রেনুকা মাটিতে পড়ে লুটিয়া, নিশ্চিত মৃত হয়েছে। পরক্ষণে হাতের কুঠার নামাতে চাইলেও পারলো না, কুঠার লেগে থাকল। স্বর্গপ্রাপ্তির আশায় করলেও পাপ লাভ হল কি তাতে?
পিতা বলে শোন বাচা তোমারে দেই বলি,তাড়াতাড়ি হিমালয়ে তুমি যও চলি। সেখানে আছে এক পর্বতসরোবর, ব্রহ্মপুত্র নাম যার শুনো তার খবর: "স্নান কর যাইয়া তুমি সরোবরের জলে, হাতের কুঠার নামবে তখন প্রভূর কৃপা ফলে"।
পিতার কথা শুনে পরশুরাম করলো গমন, হিমালয় পৌঁছে সরোবর পেলো। ভক্তি মনে কুঠার সহ স্নান করে যখন, সাথে সাথে হাতের কুঠার পড়ে যায়। চিন্তিত হয়ে পরশুরাম ভাবে, এখানে থাকিলে সরোবর কে আসবে এখানে। এই সরোবর এখানে আর রাখবো না আমি, হাতের কুঠার লাঙ্গল করে করবো টানাটনি। যেই কথা সেই কাজ টানিতে লাগলো, টানিতে টানিতে ব্রহ্মপুত্র সরোবর এখানে আনিলো। এখানে আসিয়া লাঙ্গল টানা করলো বন্ধ, সেই থেকে হয় জায়গার নাম লাঙ্গলবন্ধ।
এই প্রবিত্র লাঙ্গলবন্ধ স্নান প্রতি বছর চৈত্র অষ্টমী তিথিতে যথারীতি লগ্নে হয়ে থাকে। গত বছর এই মহাঅষ্টমী স্নানের তারিখ ছিল ২৭শে মার্চ ২০১৫ ইংরাজী। নির্ধারিত লগ্ন ছিল ৮টা ১৯মিঃ ৪০ সেকেন্ডে।
আমার স্ত্রীর অনুরোধে ২৬শে মার্চ ২০১৫ ইংরাজী তারিখে রাত ১২টার সময় আমার স্ত্রীর বড়বোন সহ আমরা তিনজন রওনা দিলাম মহাঅষ্টমী স্নানের উদ্দেশে। বাস গাড়ি যোগে রাত ১টা ৩০মিঃ সময় লাঙ্গলবন্ধ পৌঁছাই। সরারাত সেখানে ঘোরা-ফেরা করে আর কেনা-কাটা করে সময় পাড় করলাম।
লগ্ন আরম্ভ হওয়ার পর আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরবো মনস্থির করলাম। সকালবেলা লগ্ন হওয়ার কাছাকাছি সময়ে প্রতিটি স্নান ঘাটে বহু লোকের সমাগম। কার আগে কে স্নান করবে এই নিয়ে চলে হুলস্থুল। মানুষের সুবিধার জন্য এখানে মোট ১১টি স্নান ঘাট আছে, তার মধ্যে রাজ বাড়িঘাট অন্যতম। লোকের সমাগম এই ঘাটেই বেশি হয়। তাছাড়া ঘাট ছাড়াও নৌকা নিয়েও অনেক মানুষকে স্নান করতে দেখা যায়।

আমরা রাজবাড়ি ঘাটে অবস্থান নিলাম, এখানে মহিলাদের কাপড়চোপড় বদলা-বদলির সুব্যবস্থা আছে। স্নান লগ্ন আরম্ভ হল, হুলস্থুলের মধ্যেই স্নান করতে হবে, নাহয় সকালবেলা বাসায় ফিরে আর অফিস করার সময় পাওয়া যাবেনা বলে মনে মনে ভাবছি। আমার স্ত্রী সহ দুইজন একসাথে স্নান করবো, সাথে করে নিয়ে যাওয়া টাকাপয়সা আমার স্ত্রীর বড়বোনের নিকট রেখে দুইজন স্নান করতে নামলাম ঘাটে, স্নান করলাম বাবা মায়ের নামে পিন্ডি দিয়ে ঘাট হতে উঠে এলাম।
আমার স্ত্রী উঠে কাপড়চোপড় বদলানোর জন্য গেলো বদলা-বদলির স্থানে। সেখান থেকে এসে বড়বোনকে বললো দিদি তুমি যাও স্নান করার জন্য তাড়াতাড়ি করে, একটু পরে আরো ভিড় বাড়বে তখন স্নান করতে কষ্টকর হবে। বড়বোন আচ্ছা ঠিক আছে যাই তবে। আমার স্ত্রী বড়বোনকে বলল আমার টাকাপয়সা বুঝিয়ে দিয়ে যাও। তখন বড়বোন কোমরে গুজে রাখা স্থানে হাত দিয়েই আবার কপালে হাত। আমার স্ত্রী বলে কি দিদি কি হলো টাকা? আমার স্ত্রীর বড়বোন কাঁদতে লাগল, আর খুঁজতে লাগল চারদিক। আমি জানতে চাইলাম টাকার সংখ্যা কত? আমার স্ত্রী ভয়ে আর টাকার সংখ্যা বললো না। আর কি করা, তীর্থে এসে সর্বহারা হলাম।
আমি আমার স্ত্রীর বড়বোনে বললাম যা হবার তো হলো, এবার স্নান করে আসুন। বড়বোনও স্নান করলো, কাপড়চোপড় বদলাল, ভেজা কাপড়চোপড় বেগে ভরে রাজঘাট ত্যাগ করলাম আর হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমার স্ত্রীকে বললাম সত্যি করে বল টাকার সংখ্যা কত? তখন কাঁদতে কাঁদতে বললো ২৫০০/= টাকা।
আমার নাতিনদের জন্য কিছু কিনবো বলে টাকা গুলো আনলাম স্নানে, আর সেই টাকা নিলো চোরে। স্ত্রীকে বললাম, পুণ্যস্থানে চুরিচামারি করাও এক প্রকার পুণ্যকর্ম। তীর্থস্থানে তীর্থ করে যদি সবার পুণ্য হতো বা পাপমুক্ত হতো তবে সবাই একমাস আগে থেকে লাইন ধরে বসে থাকতো পাপমুক্তির আশায়।
আমরাও তো পুণ্যস্নান করলাম, আমাদের তো পুণ্য হয় নাই। পুণ্য যদি হতো তবে এত কষ্টের রোজগারের টাকা চুরি হবে কেন? পুণ্যকর্ম করেছে ঐ চোরে, পাপ থেকে মুক্তি লাভ হলেও ঐ চোরে। আর পাপমুক্ত হয়েছে যহারা ব্রিজভাংলো হুজুগে পড়ে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে তাদের। তাহারাই হয়েছে স্বর্গবাসি। তাদের হলো স্নান করার সাথে সাথে কত গুলো টাকা পেয়ে গেল, আর স্নান করার সাথে সাথে কিছু লোককে ভগবান স্বর্গে নিয়ে গেল। এটাও একটা পুণ্যের ফল।
এই পোস্টটি সহযোগিতায় ও তথ্য-সহ তৈরি করা হয়েছে:
ChatGPT by OpenAI
তথ্য ও নির্দেশনা সাধারণ ধর্মীয় শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় রীতিনীতি বা শাস্ত্রীয় জ্ঞান অর্জনের জন্য ধর্মীয় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
|
নিতাই বাবু
পুরস্কারপ্রাপ্ত নাগরিক সাংবাদিক – ২০১৭। লেখালেখির শুরু শৈশবে, এখনো চলছে। 🌐 ব্লগ: নিতাই বাবু ব্লগ | জীবনের ঘটনা | চ্যাটজিপিটি ভাবনা |

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
nitaibabunitaibabu@gmail.com