কদম রসূল দরগাহের ইতিহাস ও কিছু শোনা কথা
একসময় আমাদের বাসস্থান ছিল নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানাধীন লক্ষ্মণখোলা আদর্শ কটন মিলস্ অভ্যন্তরে। তাই কোনোএক সময় কদম রসূল দরগাহ'র বাৎসরিক ওরশ উপলক্ষে যেই মেলা বসে, সেই মেলায় ঘুরতে যেতাম।
কদম রসূল দরগাহ'র ওরশ উপলক্ষে মেলায় গিয়েই প্রথমে যেতাম, দরগাহ অভ্যন্তরে থাকা কদম রসূল নামে কালো পাথর দেখতে। দেখতে গিয়ে পায়ের ছাপযুক্ত কালো পাথরটি ছুঁয়ে ভক্তি করতাম। তারপর হাত পেতে থাকতাম পাথর থেকে ঘামানো দুই-তিন ফোঁটা জলের জন্য। খাদেম সাহেব হাতের তালুতে দুই-তিন ফোঁটা জল দিলে তা চুমু দিয়ে খেতাম, মাথায় মাখতাম। তারপর হতো মেলায় ঘুরাঘুরি। এ ছোটবেলার কথা। তারপর যখন হাঁটি হাঁটি পা পা করে বড় হলাম, তখন লোকমুখে শুনতাম এই কদম রসূল দরগাহ নিয়ে নানারকম কাহিনী।
কদম রসূল দরগাহ নিয়ে লোকমুখে যা শোনা যেতো, তা হলো এরকম:
অনেকেই বিশ্বাস করে, পবিত্র দরগাহ'টি গায়েবি উঠেছিল।
কিন্তু তা কীভাবে?
❝শোনা যায়, একদিন রাতভোর হতে-না-হতেই মজমপুর (বর্তমান কদম রসূল) গ্রামের মানুষ এই দরগাহ শরিফটি দেখতে পায়। তাই অনেকের ধারণা এটি আল্লাহতাওলা'র অশেষ মেহেরবানিতে মাটির নিচ থেকে উঠেছিল বলেই, এই পবিত্র কদম রসূল দরগাহের আশপাশের কিছু জায়গা নিয়ে টিলাকৃতি হয়ে আছে। আর টিলার উপর আছে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর কদম মোবারক।
যেহেতু এটি মাটি ফুঁড়ে উপরে উঠেছিলো। আর এই কারণেই পদচিহ্ন ছাপযুক্ত পবিত্র পাথরটি ঘিরেই এলাকাটার নাম হয় নবীগঞ্জ। যেহেতু এটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পায়ের ছাপযুক্ত একটি পাথর, তাই। আর যেই স্থানে এই পবিত্র পাথরটি পাওয়া গিয়েছিল, সেই স্থানটির নাম হয়ে যায় কদম রসূল (পূর্বের নাম মজমপুর)।
যেই স্থানে এই পবিত্র পদচিহ্ন ছাপযুক্ত পাথরটি বর্তমানেও রক্ষিত আছে, এটিই কদম রসূল দরগাহ নামে সবার কাছে পরিচিত।❞
শোনা যায়, কদম রসূল নামে যেই পাথর খণ্ডটি, ওরশের সময় হলেই, পাথর ঘেমে জল বের হয়। সেই জল অনেকের কাছে পবিত্র জল বা গায়েবি পানি। ওরশের সময় দেখা যায় অনেক ভক্ত ওই জল বা পানি চুমু দিয়ে মুখে নেয়। নিজেও ওরশের সময় মেলায় গেলে সেই জল মুখে নিতাম, চোখে ও মাথায় মাখতাম।
আবার শোনা যায় এরকম:
মজমপুর (বর্তমান কদম রসূল) গ্রামে একজন দরিদ্র লোক ছিলেন। একরাতে লোকটিকে স্বপ্নে আদেশ করলেন, ❝টিলার উপরে যাও! সেখানে একটি প্রস্তর খণ্ড (পাথরের খন্ড) দেখতে পাবে! এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তোমাকে দেওয়া হলো। তুমি প্রস্তর খণ্ডটি যেখানে পাবে, সেখানে সেই জায়গায়ই রক্ষণাবেক্ষণ করা সহ প্রস্তর খণ্ডটি সেবাযত্ন করতে থাকো। এতে তোমার মঙ্গল হবে।❞
এরপর লোকটি খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে টিলার উপরে গেল। টিলার উপরে উঠে ঠিকই একটি প্রস্তর খণ্ড(পাথরের খণ্ড) দেখতে পায়। পূর্বের সূর্যের আলোতে তখন প্রস্তর খণ্ডটি ঝিলমিল করছিল। লোকটি সামনে গিয়ে প্রস্তর খণ্ডটিতে পদচিহ্নের ছাপ দেখতে পেয়ে, প্রস্তর খণ্ডটি সালাম করে বুকে নিয়ে সেখানেই বসে পড়লো। এই খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো গ্রাম ছেড়ে শহরে।
একসময় সেখানকার স্থানীয় মানুষ সেই জায়গায় একটি টিনের চালযুক্ত ঘর তৈরি করে, সবাই সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি সময়ে সেখানে জিকিরের সাথে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করতেন এবং বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে এই পবিত্র দরগাহ শরিফে বাৎসরিক ওরশ করতে শুরু করেন।
এরপর কদম রসূল দরগাহ'র উরশ-এর কথা পৌঁছে যায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা'র কানে। তখন তিনি একটা জটিল রোগে ভুগতে ছিলেন। তিনি তাঁর রোগমুক্তির জন্য এই পবিত্র কদম রসূল দরগাহ শরিফে মানত করলেন। এর কিছুদিন পরই নবাব সিরাজউদ্দৌলা'র সেই কঠিন রোগ নিরাময় হয়ে যায়।
এরিমধ্যে দরগাহ থেকে পদচিহ্নের ছাপযুক্ত (প্রস্তর খন্ড) পাথরটি চুরি হয়ে যায়। চোরে চুরি করে আর সারতে না পেরে একদিন এই পবিত্র পদচিহ্ন ছাপযুক্ত পাথরটি নিকটস্থ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দিয়ে কোনরকম দায়মুক্ত হয়। পাথরটি থেকে যায় শীতলক্ষ্যা নদীগর্ভেই।
এদিকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা'র রোগ নিরাময় হওয়াতে তিনি মনস্থির করলেন, একসময় তিনি এই পবিত্র কদম রসূল দরগাহ জিয়ারত করবেন। একসময় তিনি লোকজন নিয়ে এই পবিত্র দরগাহের উদ্দেশে রওনা হলেন। সাথে ছিল নবাবকে বহন করার বিশালাকৃতির এক হাতি। যেই হাতি চড়ে তিনি এখানে সেখানে পরিদর্শনে যেতেন। সেই হাতি চড়েই আসলেন বর্তমান হাজীগঞ্জ গুদারা ঘাটের সামনে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে।
এরপর তিনি শীতলক্ষ্যা নদী পার হলেন নৌকা চড়ে। আর তাকে বহন করা হাতিটি নদী পার হলো সাঁতরে। হাতিটি শীতলক্ষ্যা নদী সাঁতরে পার হয়ে যখন কদম রসূল দরগাহ বরাবর নদীর পাড়ে উঠেছিল, তখন সবাই দেখে হাতির গলার লোহার চেইন'র শেষাংশ সোনালি রং হয়ে ঝিলমিল করছে।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা তখন পবিত্র দরগাহ শরিফে গিয়ে জানতে পারে পদচিহ্ন ছাপযুক্ত পাথরটি কিছুদিন আগে কে-বা-কারা চুরি করে নিয়ে গেছে। পবিত্র পাথরটি চুরি হয়েছে শুনে নবাব সিরাজউদ্দৌলা তখন আশাহত হয়ে পরেন। সেই মুহূর্তেই হাতির গলার চেইন'র শেষাংশ সোনালি রং হয়ে যাওয়ার খবরটা নবাব সিরাজউদ্দৌলা'র কানে আসে।
তখন নবাব সিরাজউদ্দৌলা কয়েকজন ডুবুরিকে খবর দেয়। ডুবুরিরা এসে হাতি যেই জায়গা দিয়ে নদীর পাড়ে উঠেছিল, সেই জায়গায় তল্লাশি করে পাথরটি খুঁজে পেয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলা'র হাতে দেয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলা পবিত্র পাথরটাকে সালাম করে দরগাহ'র খাদেমের কাছে বুঝিয়ে দেয়।
এরপর নবাব সিরাজউদ্দৌলা ঢাকায় অবস্থিত আহসান মঞ্জিলের অনুরূপ কদম রসূল দরগাহ নির্মাণ করে দেন। তাই ঢাকার ইসলাম পুরের বর্তমান আহসান মঞ্জিলের সামনের আকৃতি যেরকম, নবীগঞ্জ কদম রসূল দরগাহের সানের আকৃতিও একইরকম দেখা যায়।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় আরেকরকম:
আগেই বলে রাখা ভালো, কদম রসুল বলতে বোঝায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পায়ের ছাপযুক্ত একটি পাথর। ইসলাম ধর্মাবলম্বী অনেকের বিশ্বাস মহানবী হযরত মোহাম্মদ(সাঃ) হেঁটে যাওয়ার সময় প্রস্তর খন্ডের উপর পায়ের ছাপ থেকে যেতো।
এই পদচিহ্ন ছাপযুক্ত প্রস্তর খণ্ড মক্কা থেকে অনেকেই নিয়ে যেতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। এধরনের প্রস্তর খন্ড ঘিরে পশ্চিমের জেরুজালেম হতে পূর্বে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পর্যন্ত গড়ে উঠেছে সৌধ, দরগাহ। এরকম একটি সৌধ বা দরগাহ হলো নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানাধীন বর্তমান নবীগঞ্জ ‘কদম রসুল’ দরগাহ। যা এখন পবিত্র কদম রসূল দরগাহ নামে সারাদেশে পরিচিত। এই কদম রসূল দরগাহ ভূমি থেকে ৩০ ফুট উঁচুতে একটি টিলার উপর স্থাপিত।
কিছু ইতিহাসবিদদের মতে:
এই কদম রসুল দরগাহ পাঁচ’শ বছরের পুরানো আধ্যত্মিক এবং অলৌকিক ঘটনাবলির প্রাণকেন্দ্র। প্রচলিত আছে যে, মুহাম্মদ (সাঃ) মিরাজের রাত্রে বোরাকে উঠার পূর্বে পাথরে তার পায়ের কিছু ছাপ অঙ্কিত হয়। পরবর্তীতে সাহাবিগণ পদ চিহ্নিত পাথরগুলো সংরক্ষণ করেন বলে অনেকে দাবি করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পাথরটি বর্তমানে জেরুজালেমে সংরক্ষিত আছে। এছাড়া ইস্তাম্বুল, কায়রো এবং দামেস্কে অনুরূপ পাথর সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও সমগ্র ভারতবর্ষে এরকম প্রস্তরখন্ডের সংখ্যা ১৪টি। এরমধ্যে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে দুইটি, নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে পূর্বের মজমপুর গ্রাম বর্তমান কদম রসূল গ্রামে একটি। যা এখন ইতিহাস খ্যাত কদম রসূল দরগাহ।
আরেক মতে, ৯৮৬ হিজরি ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী আফগান নেতা মাসুম খান কাবুলি পদচিহ্ন সংবলিত এ পাথরটি একজন আরব বণিকের কাছ থেকে কিনেছিলেন। ঈসা খাঁর সাথে এই রাজার সখ্যতা ছিল। পরে মাসুম খান বন্দরের নবীগঞ্জ এলাকাতে বিশাল জায়গা নিয়ে ৩০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু মাটির টিলা তৈরি করে ওই পদচিহ্ন স্থাপন করেন। এর পর থেকেই প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) কদম মোবারক (পদচিহ্ন) সংবলিত এই কালো পাথরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ইতিহাস খ্যাত কদম রসূল দরগাহ।
কীভাবে আসবেন?:
প্রথমে ঢাকা থেকে গুলিস্তানের বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেট অথবা একটু দক্ষিণে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে উঠার পথে বন্ধন, আনন্দ, উৎসব বাসের টিকেট কাউন্টার রয়েছে। টিকেট সংগ্রহ করার পর বাসে চড়ে ৪০ মিনিটেই সরাসরি চলে আসতে পারবেন নারায়ণগঞ্জ (টার্মিনাল) বন্দর গুদারা ঘাট অথবা চিটাগং রোড থেকে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা পরিবহনে চড়ে সরাসরি চলে আসুন হাজীগঞ্জ গুদারা ঘাট। তারপর খেয়ানৌকা চড়ে শীতলক্ষ্যা নদী পাড় হয়ে হাতের একটু ডানে গেলেই কদম রসূল দরগাহ শরিফ চোখের সামনে দেখতে পাবেন। আর যদি নারায়ণগঞ্জ টার্মিনাল বন্দর গুদারা ঘাট হয়ে যেতে চান, তবে শীতলক্ষ্যা নদী পাড় হয়ে অটোয় চড়ে চলে যাবেন নবীগঞ্জের কদম রসূল দরগায়।
প্রিয় পাঠক, লেখা পড়ে ভালো লাগলে দয়াপূর্বক লাইক/কমেন্ট ও শেয়ার করে বাধিত করবেন।
ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম,
১৩/০৫/২০২৩ইং।
🌺🌺
উত্তরমুছুনসুন্দর মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
মুছুনজানা হলো!
উত্তরমুছুনসুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ!
মুছুন